জীবন খুব ছোট, যেকোনো সময় আমি মারা যেতে পারি: সৌদি প্রিন্স

টমাস এল ফ্রিডম্যান: আমি কখনোই ভাবিনি যে এই বাক্যটি লেখার জন্য আমাকে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে হবে: মধ্যপ্রাচ্যের যে জায়গায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রক্রিয়াটি এখন হয়ে চলেছে, সেটা হচ্ছে সৌদি আরব। হ্যাঁ, আপনি ঠিক বাক্যটিই পড়ছেন। যদিও শীতকালের শুরুতে আমি এখানে এসেছি, কিন্তু আমি দেখলাম দেশটি আরব বসন্তের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

তবে এই আরব বসন্ত অন্যান্য আরব বসন্তের মতো নয়। তিউনিসিয়া ছাড়া অন্যান্য সব আরব বসন্তই ব্যর্থ হয়েছে। আর এই আরব বসন্তে নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশটির ৩২ বছর বয়সী যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। এই আরব বসন্ত যদি সফল হয়, এটা শুধু সৌদি আরবের চরিত্রকেই বদলে দেবে না, সারা বিশ্বের ইসলামের স্বরূপ ও ধারাকেও বদলে দেবে। তবে এও ঠিক যে কেবল বোকারাই এর সাফল্যের কথা ভাবতে পারে।

বিষয়টা ভালোভাবে বোঝার জন্য আমি সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সাক্ষাৎকার নিতে রিয়াদে আসি। তবে তিনি নভেম্বর মাসের গোড়ার দিকে ঘটে যাওয়া ঘটনার ব্যাপারে কিছু বলেননি। চলতি মাসের গোড়ার দিকে সৌদি সরকার দুর্নীতির অভিযোগে বেশ কিছুসংখ্যক রাজপুত্র ও মন্ত্রীকে গ্রেপ্তার করে এবং রিয়াদের রিৎজ কার্লটন হোটেলের ভেতরে অবস্থিত একটি জেলে পাঠায়।

রিয়াদের উত্তরে ওউজা এলাকায় যুবরাজ সালমানের পারিবারিক প্রাসাদে আমি তার সঙ্গে দেখা করি। সেখানে তখন যুবরাজ ছাড়াও তার ভাই প্রিন্স খালিদ, যিনি কিনা যুক্তরাষ্ট্রে সৌদি আরবের নবনিযুক্ত রাষ্ট্রদূত এবং কয়েকজন সিনিয়র মন্ত্রী ছিলেন। যুবরাজ ইংরেজিতেই উত্তর দিয়েছেন। প্রায় চার ঘণ্টা ধরে সাক্ষাৎকার নেওয়ার পর রাত ১টা ১৫ মিনিটে আমি ক্ষান্ত দিই। বহুদিন পর কোনো আরব নেতা তার দেশকে রূপান্তর করার বিষয়ে নতুন নতুন ধারণা সম্পর্কে আমাকে বললেন।

আমরা সুস্পষ্ট প্রশ্ন দিয়ে শুরু করেছিলাম: রিৎজ হোটেলে কী ঘটছে? আর তার এই ক্ষমতার খেলা কি তার পরিবার এবং বেসরকারি খাতের প্রতিদ্বন্দ্বীদের নির্মূল করার জন্য? আর তার অসুস্থ বাবা বাদশাহ সালমান কি দেশের ক্ষমতার চাবি তার হাতে তুলে দিয়েছেন?

যুবরাজ বলেন, এটা হাস্যকর যে এই দুর্নীতিবিরোধী অভিযানকে ক্ষমতা দখল বলে মনে করা হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, রিৎজ হোটেলে বন্দী বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট সদস্য ইতিমধ্যে তার ও তার সংস্কারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছেন এবং ‘রাজপরিবারের বেশির ভাগই’ তার পেছনে রয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশকে ১৯৮০ সাল থেকে আজ পর্যন্ত দুর্নীতির কারণে অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। আমাদের বিশেষজ্ঞদের হিসাবমতে, প্রতিবছর সব সরকারি ব্যয়ে মোটামুটি ১০ শতাংশ দুর্নীতি হয়। শীর্ষ পর্যায় থেকে নিম্ন পর্যায় পর্যন্ত এই দুর্নীতি হয়। বছরের পর বছর ধরে বহু সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। কিন্তু তারা সবাই ব্যর্থ হয়েছে। কেন? কারণ তারা সব সময় নিচ থেকে শুরু করেছিল।’

কাজেই যখন তার বাবা ২০১৫ সালে সিংহাসনে আরোহণ করলেন (যখন তেলের দাম পড়ে গিয়েছিল), তখন তিনি দুর্নীতি বন্ধ করার অঙ্গীকার করলেন। বাদশাহ সালমান পাঁচ দশক ধরে রিয়াদের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে কখনো কোনো দুর্নীতির অভিযোগ ওঠেনি।

যুবরাজ বলেন, ‘আমার বাবা দেখেছিলেন যে আমাদের জি-২০-এ থাকার কোনো উপায় নেই এবং দুর্নীতি হতেই থাকবে। ২০১৫ সালের প্রথম দিকে আমার বাবা তার দলকে উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতি-সম্পর্কিত সব তথ্য সংগ্রহ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এই দল দুই বছর ধরে কাজ করেছে, যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা সঠিক তথ্য সংগ্রহ করতে পেরেছে। তখন ২০০ দুর্নীতিবাজের নাম বের হয়ে আসে।’

যুবরাজ বলেন, যখন সব তথ্য প্রস্তুত, তখন সরকারি কৌঁসুলি সৌদ আল মজিব ব্যবস্থা নিলেন। গ্রেপ্তারকৃত প্রত্যেক ব্যবসায়ী ও রাজপুত্রকে দুটি বিকল্প দেওয়া হয়েছিল। আমাদের কাছে যা নথিপত্র ছিল, সব তাদের দেখাই। এদের ৯৫ শতাংশ নিষ্পত্তি করতে রাজি হন। তার মানে হচ্ছে, তারা নগদ অর্থ বা ব্যবসার অংশবিশেষ সৌদি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেবেন।

মাত্র ১ শতাংশ প্রমাণ করতে পেরেছেন যে তারা পরিষ্কার। তাদের বিরুদ্ধে মামলা তখনই প্রত্যাহার করা হয়। প্রায় ৪ শতাংশ বলেছেন, তারা কোনো দুর্নীতি করেননি এবং তারা আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতের দ্বারস্থ হবেন। সৌদি আইন অনুযায়ী সরকারি কৌঁসুলি স্বাধীন। আমরা কেউ তার কাজে হস্তক্ষেপ করতে পারি না। কেবল বাদশাহ তাকে বরখাস্ত করতে পারেন। কিন্তু তিনি এই প্রক্রিয়াটি চালাচ্ছেন এবং আমাদের বিশেষজ্ঞরা এটা নিশ্চিত করেছেন যে এই প্রক্রিয়ায় বেকারত্ব এড়ানোর জন্য কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে দেউলিয়া করা হয়নি।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী পরিমাণ অর্থ তারা উদ্ধার করেছেন?

যুবরাজ বলেন, সরকারি কৌঁসুলি জানিয়েছেন, এটা প্রায় ১০ হাজার কোটি ডলার। তিনি আরও বলেন, শীর্ষ থেকে নিম্ন পর্যায় পর্যন্ত সব ধরনের দুর্নীতি নির্মূল করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। কাজেই আমাদের একটি সংকেত দিতে হবে এবং এই সংকেত দেওয়া চলতেই থাকবে। আমরা এ থেকে সরে যাব না এবং আমরা ইতিমধ্যে এর প্রভাব দেখছি। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে লোকজন এ নিয়ে লেখালেখি করছে। তবে সৌদি ব্যবসায়ী যারা সেবা পাওয়ার জন্য আমলাদের ঘুষ দিয়েছেন, তাঁদের বিচার করা হচ্ছে না। তাদেরই বিচার করা হচ্ছে, যারা দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারের টাকা নিজেদের পকেটে ভরেছেন।

একটা জিনিস আমি বলতে পারি, আমি অনেক সৌদি নাগরিকের সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলেছি, তাদের কেউ এই দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের ব্যাপারে স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন ব্যক্ত করেননি। তবে সৌদি আরবের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ব্যবসায়ী ও প্রিন্সদের দুর্নীতিতে স্পষ্টতই বিরক্ত। আমার মতো বিদেশি যখন এই অভিযানের বৈধতা নিয়ে তাদের জিজ্ঞাসা করেন, তখন তাদের মনোভাব এ রকম ছিল, ‘তাদের একদম উল্টে ফেলো, তাদের পকেট থেকে সব অর্থ বের করো, যতক্ষণ না সব অর্থ বের হয়, ততক্ষণ তাদের ঝাঁকাতে থাকো।’

তবে দুর্নীতি দমন অভিযান হচ্ছে মোহাম্মদ বিন সালমানের দ্বিতীয় উদ্যোগ। প্রথমটি হলো সৌদি আরবকে আরও উদার ও আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত করা, যেমনটি ছিল ১৯৭৯ সালের আগ পর্যন্ত। সম্প্রতি একটি বৈশ্বিক সম্মেলনে যুবরাজ সালমান সৌদি আরবকে উদার রাষ্ট্র হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে রয়েছে ভারসাম্যপূর্ণ ইসলাম, যা কিনা গোটা বিশ্ব, সব ধর্ম, সব ঐতিহ্য ও মানুষের জন্য উন্মুক্ত। এর লক্ষ্যে তিনি কাজ করে যাচ্ছেন।

যুবরাজ বলেন, জীবন খুব ছোট, যেকোনো সময় আমি মারা যেতে পারি। সৌদি আরবের পরিবর্তন আমি নিজের চোখে দেখে যেতে চাই। কাজেই আমি এখন তাড়াহুড়ার মধ্যে আছি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।